Monday, September 28, 2026
হোম জাতীয় বনভূমির ওপর রিসোর্ট, সাভারে ‘এগ্রো ট্যুরিজম’ প্রকল্পে বড় ঝুঁকি

বনভূমির ওপর রিসোর্ট, সাভারে ‘এগ্রো ট্যুরিজম’ প্রকল্পে বড় ঝুঁকি

স্টাফ রিপোর্টার:

সাভারের ছোট কালিয়াকৈর এলাকার কামালপুরে প্রায় ১৭ একর বনভূমিকে ঘিরে ‘এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট’ নামে একটি প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উদ্যোক্তাদের প্রচারণায় প্রকল্পটিকে আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও জমির ব্যবহার, প্রকল্পের অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রকল্পের পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে অভিযোগ উঠেছে, বনভূমি ও আশপাশের কৃষিজমি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে তা ভূমি ব্যবহার, বন সংরক্ষণ ও পরিবেশগত বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো ও বিনিয়োগকারীদের মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয়েও স্পষ্টতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের জন্য যে প্রায় ১৭ একর জমি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, তার বড় অংশ বন বিভাগের জমি বা বনভূমির আওতাভুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ধরনের সরকারি বনভূমি বাণিজ্যিক রিসোর্ট, পর্যটনকেন্দ্র কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি নীতিমালা কীভাবে অনুসরণ করা হয়েছে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বন বিভাগের জমি লিজ বা চুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারের কথা বলা হলেও সেই চুক্তির ধরন, মেয়াদ, শর্ত এবং বাণিজ্যিক রিসোর্ট পরিচালনার অনুমোদন কতটা বৈধ—তা স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো সরকারি বনভূমি নির্দিষ্ট শর্তে ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও সেই অনুমতিকে ভিত্তি করে ব্যক্তিগত মালিকানা বা স্থায়ী বাণিজ্যিক অধিকার সৃষ্টি হয় না। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত হলে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন বাতিল করলে জমি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রকল্পে বিনিয়োগ করা অর্থও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

প্রকল্পের আওতায় রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের জন্য আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমি কেনা বা ব্যবহার করার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। কৃষিজমি বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভূমি ব্যবহার নীতি ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

উর্বর কৃষিজমিতে পাকা স্থাপনা নির্মাণের ফলে একদিকে কৃষি উৎপাদনের জমি কমতে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় পরিবেশ ও ভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাভারের বিরুলিয়া ও আশপাশের বন বিটসংলগ্ন এলাকায় বনাঞ্চল, কৃষিজমি ও জলাধারভিত্তিক একটি স্থানীয় পরিবেশব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে বড় পরিসরে পর্যটন কার্যক্রম চালু হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ, পানি ব্যবহারের চাপসহ বিভিন্ন কারণে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে পরিবেশসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

প্রকল্পের প্রচারণায় সীমিত সংখ্যক শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও মোট প্রকল্প ব্যয়, শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার, লভ্যাংশ বণ্টন, জমির ব্যবহারাধিকার এবং প্রকল্প ব্যর্থ হলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে যে জমির ওপর প্রকল্পের মূল অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটি যদি লিজ বা অন্য কোনো অস্থায়ী ব্যবহারের অধিকারে থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত মালিকানা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

বনভূমির মালিকানা বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ না থাকলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারি অনুমোদন ও চুক্তির ওপর। কোনো পর্যায়ে সেই অনুমোদন বাতিল হলে বা জমি পুনরুদ্ধার করা হলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ারের মূল্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তার সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো থাকা জরুরি।

প্রকল্পটির পক্ষে স্থানীয় কৃষক ও কৃষির সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করে অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে কৃষিজমি ও বনভূমির ওপর স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

একটি প্রকৃত এগ্রো ট্যুরিজম প্রকল্পে কৃষি, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু বন ও কৃষিজমির ওপর বাণিজ্যিক স্থাপনা, কটেজ ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে সেটি স্থানীয় কৃষি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

পর্যটকের অতিরিক্ত উপস্থিতি, যানবাহনের চাপ, শব্দ, বর্জ্য এবং পানি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়লে স্থানীয় কৃষিকাজ ও গ্রামীণ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA), ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন এবং বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়গুলোও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে বনভূমি ও কৃষিজমির সংযোগস্থলে বড় আকারের পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার আইনগত পদক্ষেপের মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এতে শুধু উদ্যোক্তা নয়, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

সব মিলিয়ে সাভারের কামালপুরে প্রস্তাবিত এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিকানা ও ব্যবহারাধিকার, বন বিভাগের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তনের বৈধতা, প্রকল্পের মোট বিনিয়োগ কাঠামো এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

বিশেষ করে বনভূমির ওপর প্রকল্পের অধিকার যদি লিজ বা সীমিত ব্যবহারের মধ্যে থাকে, তাহলে সেই জমির ওপর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হবে, সেটি লিখিত ও আইনসম্মতভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভূমি ব্যবহারের বৈধতা এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুরক্ষার সুস্পষ্ট কাঠামো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটিকে ঘিরে থাকা ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ও বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, অনুমোদন ও চুক্তিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ

স্টাফ রিপোর্টার: সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য নির্মল বায়ুর বিকল্প নেই। কিন্তু বায়ুদূষণ, ধূমপান ও বিভিন্ন ধরনের তামাকজাত ও নিকোটিন পণ্যের ব্যবহারে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের...

কবরস্থান বাড়ছে না, বাড়ছে দাফন; পুরোনো কবরেই নতুন ঠিকানা

বিশেষ প্রতিনিধি: ঢাকায় একটি বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা সামান্য এক টুকরো জমির জন্য যেমন দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও অনেক সময় যথেষ্ট হয় না, তেমনি রাজধানীতে মৃত্যুর পর একটি...

ফেনীর সদ্যবিদায়ী সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিমকে সম্মাননা

ফেনী প্রতিনিধি | জনতার কণ্ঠ : ফেনী জেলার সদ্যবিদায়ী সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান উপপরিচালক (অর্থ) ডা. মো. রুবাইয়াত বিন করিমের পদোন্নতিজনিত সম্মাননা সভা...

জনপ্রিয় খবর

ঢাকা থার্ড ডিভিশন কোয়ালিফাইংয়ে জয় দিয়ে যাত্রা শুরু ফ্রেন্ডশিপ ক্রিকেট ক্লাবের

ফেনী প্রতিনিধি: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ঢাকা মেট্রোপলিটন ক্রিকেট কমিটি আয়োজিত ঢাকা থার্ড ডিভিশন কোয়ালিফাইং ক্রিকেট টুর্নামেন্টে জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ফেনীর ফ্রেন্ডশিপ ক্রিকেট...

ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ

স্টাফ রিপোর্টার: সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য নির্মল বায়ুর বিকল্প নেই। কিন্তু বায়ুদূষণ, ধূমপান ও বিভিন্ন ধরনের তামাকজাত ও নিকোটিন পণ্যের ব্যবহারে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের...

বনভূমির ওপর রিসোর্ট, সাভারে ‘এগ্রো ট্যুরিজম’ প্রকল্পে বড় ঝুঁকি

স্টাফ রিপোর্টার: সাভারের ছোট কালিয়াকৈর এলাকার কামালপুরে প্রায় ১৭ একর বনভূমিকে ঘিরে ‘এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট’ নামে একটি প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।...

কবরস্থান বাড়ছে না, বাড়ছে দাফন; পুরোনো কবরেই নতুন ঠিকানা

বিশেষ প্রতিনিধি: ঢাকায় একটি বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা সামান্য এক টুকরো জমির জন্য যেমন দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও অনেক সময় যথেষ্ট হয় না, তেমনি রাজধানীতে মৃত্যুর পর একটি...

সর্বশেষ মন্তব্য

2